আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ'র পরিবর্তে অংশ নেবে স্কটল্যান্ড। শনিবার (২৪ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজ তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পরিবর্তে জায়গা নিশ্চিত করেছে স্কটল্যান্ড। ফলে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বদলে সি গ্রুপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড, ইতালি ও নেপালের সঙ্গী হচ্ছে স্কটল্যান্ড।
ভারতে খেলতে অনিচ্ছা প্রকাশ করা বাংলাদেশকে অবস্থান পুনর্বিবেচনার জন্য সময় দিয়েছিল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা (আইসিসি)। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
ক্রিকবাজ তাদের প্রতিবেদনে আরও জানিয়েছে, এ বিষয়ে স্কটল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহী ট্রুডি লিন্ডব্ল্যাডের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ক্রিকবাজ। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দুবাই ও এডিনবার্গের মধ্যে ইতিমধ্যে যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে।
সূচি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৭ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নামার কথা ছিল। এখন ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বদলে স্কটল্যান্ড তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। এরপর ৯ ফেব্রুয়ারি ইতালি এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি একই ভেন্যুতে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে স্কটিশরা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ১৭ ফেব্রুয়ারি মুম্বাইয়ে নেপালের বিপক্ষে খেলবে দলটি।
এর আগে, ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আইসিসিও অনড় ভারতে বিশ্বকাপ খেলতেই হবে। এই অবস্থায় সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বিসিবি ‘স্বাধীন বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটির’ (ডিআরসি) দ্বারস্থ হয়েছিল। এবার ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, এখতিয়ার বহির্ভূত হওয়ায় সেই আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে ডিআরসি। ফলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের শেষ আশাটুকুও কার্যত নিভে গেল।
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম ভালো করে জানেন, আইসিসি বোর্ডে সিদ্ধান্ত হওয়া মানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এর পরও মেইল করে সুযোগ চাওয়া মানে ‘বাই’ বলার আগে নিজেদের আর্জি জানানোর মতোই। আইসিসি আইনের ১.৩ ধারায় উল্লেখ আছে, আইসিসি বোর্ডের নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত বা আইসিসির তত্ত্বাবধানে কোনো কমিটির কোনো সিদ্ধান্ত রিভিউ করতে পারে না এই ‘ডিসপিউট রেজুলেশন কমিটি’। সাধারণত কোনো বিষয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কোনো ক্রিকেট বোর্ড যদি সমঝোতায় না আসতে পারে, তাহলে আইসিসির এই রিভিউ কমিটির আশ্রয় নেওয়া হয়। কিন্তু এখানে বিসিবির আবেদন আইসিসির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার। সে ক্ষেত্রে ওই রিভিউ কমিটির কিছুই করার নেই।
পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিসির গঠনতন্ত্রের এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণেই বিসিবির আবেদনটি গ্রহণ না করে সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হয়েছে।
ইতিপূর্বে গত বুধবার আইসিসির বোর্ড সভায় নিরাপত্তা শঙ্কার কারণ দেখিয়ে ভারতের ভেন্যু পরিবর্তনের প্রস্তাব তুলেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেখানে ১৬ সদস্যের মধ্যে ১৪ জনই বাংলাদেশের বিপক্ষে ভোট দেন। ১৪-২ ব্যবধানে হেরে যাওয়ার পরই শেষ ভরসা হিসেবে স্বাধীন সালিশি সংস্থা বা ডিআরসির কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিসিবি। কিন্তু সেখানেও আইনি জটিলতায় ব্যর্থ হলো তারা।
আইনি ও কূটনৈতিক সব দুয়ার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথই খোলা। হয় আইসিসির সিদ্ধান্ত মেনে ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ খেলা, নয়তো টুর্নামেন্ট বর্জন করা। পিটিআই জানিয়েছে, বাংলাদেশ যদি তাদের অবস্থানে অনড় থাকে, তবে আজই তাদের পরিবর্তে বদলি দলের নাম ঘোষণা করতে পারে আইসিসি। ধারণা করা হচ্ছে, র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে থাকায় স্কটল্যান্ডই সুযোগ পেতে পারে বাংলাদেশের জায়গায়।
মূলত মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার জেরে ভারতের সঙ্গে ক্রিকেটীয় বিরোধ শুরু। সেই বিরোধ বিশ্বকাপ বয়কটের মতো সিদ্ধান্তে গড়িয়েছে। অথচ ভারতের সরকারি পর্যায় থেকে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিশ্বকাপ বয়কটের মতো ঘটনা ঘটে না। ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে সেটা পরিষ্কার বলেছেন। ভারত সরকার ক্রিকেটে রাজনীতি ঢুকিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকারও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। এর ফলে ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপ খেলার সুযোগবঞ্চিত করা হলেও দেশের সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সাল—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। আকরাম খান, খালেদ মাসুদ পাইলট, মিনহাজুল আবেদীন, আমিনুল ইসলাম, হাসিবুল হোসেন, নাঈমূর রহমান দুর্জয়দের হাত ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম বড় স্বীকৃতি পায় লাল-সবুজ বাংলাদেশ। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে কেনিয়াকে হারিয়ে আইসিসি ট্রফি জয়ের সেই মুহূর্ত শুধু একটি ম্যাচের জয় ছিল না—ওটা ছিল একটি জাতির স্বপ্ন জয়ের গল্প। সেদিন কোটি কোটি হৃদয়ে জন্ম নিয়েছিল বিশ্বাস—আমরাও পারি। এরআগে, সেমিফাইনালে স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া বাংলাদেশ দল আইসিসি ট্রফি জিতে অবসান ঘটায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার।
সেই বিজয়ের পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ ক্রিকেট হয়ে ওঠে দেশের ক্রীড়াঙ্গণের অবিচ্ছেদ্য এক নাম। মাঠে নামলেই গ্যালারিতে ঢেউ খেলানো লাল-সবুজ বাংলাদেশ, রাস্তায় থমকে যেত জীবন, টিভির সামনে নিঃশব্দ অপেক্ষা—ক্রিকেট তখন শুধু খেলা নয়, এক ধরনের আবেগ, এক জাতির আত্মপরিচয়। ক্রিকেটাররা হয়ে উঠেছিলেন নায়ক, কেউ কেউ ছুঁয়েছিলেন বিশ্বসেরা হওয়ার সম্মানও। সেই সময়টাকে আজও বলা হয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের সোনালি দিন।
কিন্তু সময়ের স্রোতে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—আজ আমরা কোথায়? যে ক্রিকেট একদিন স্বপ্ন দেখাতে জানত, গর্বে বুক ভরিয়ে দিত, সেই ক্রিকেট আজ যেন দিশেহারা। মাঠের বাইরের বিতর্ক, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ব্যবধান— !