News Link: https://www.dailylalsobujbd.com/news/3j5
সারাদেশে বিস্তৃত মাদকের এক ভয়াবহ ও অদৃশ্য সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় রয়েছে ১ হাজার ৬২০ জন প্রতাপশালী ‘গডফাদার’, যাদের ইশারায় অন্তত ২০ হাজার ৮৯১ জন কারবারির সমন্বয়ে গঠিত তিনস্তরের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে হাজার কোটি টাকার মাদক বাণিজ্য। গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রতিবেদনে এই উদ্বেজনক চিত্র উঠে এলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মূল হোতাদের এড়িয়ে কেবল ‘লোকদেখানো’ অভিযানের কারণে মাদকের ছোবল থেকে মুক্তি মিলছে না; যদিও র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ জানিয়েছেন যে, অপরাধীর অন্য কোনো পরিচয়কে গুরুত্ব না দিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে র্যাবের অভিযান নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রয়েছে। সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে মাদক কারবারির সংখ্যা ২০ হাজার ৮৯১। এর মধ্যে গডফাদার ১ হাজার ৬২০, পাইকারি কারবারি ৬ হাজার ২২৭ এবং খুচরা কারবারি ১৩ হাজার ৪৪। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ৩০৯ জন গডফাদার রয়েছে। এরপর রাজশাহীতে ২৭৩, রংপুরে ২৩৭, ঢাকায় ২৩১, খুলনায় ২২৮, বরিশালে ১১৭, ময়মনসিংহে ১১৫ এবং সিলেটে ১১০ জন গডফাদার রয়েছে।
পাইকারি কারবারির মধ্যেও শীর্ষে চট্টগ্রাম ১ হাজার ৪২৭ জন। এরপর রাজশাহী ১ হাজার ২৩৭, ঢাকা ১ হাজার ১০২, রংপুর ৬৬৬, খুলনা ৬৩৪, ময়মনসিংহ ৪৮১, সিলেট ৩৬০ এবং বরিশালে ৩২০ জন। খুচরা কারবারেও চট্টগ্রাম শীর্ষে ২ হাজার ৮২৮ জন। এ ছাড়া রাজশাহীতে ২ হাজার ৫৩৯, ঢাকায় ২ হাজার ৪৮৯, খুলনায় ১ হাজার ৯৮২, ময়মনসিংহে ৯৮৩, রংপুরে ৯৫৪, সিলেটে ৬৪৮ ও বরিশালে ৬২১ জন খুচরা কারবারি সক্রিয় রয়েছে।
মাদক কারবারিদের এ বিশাল তালিকার গোয়েন্দা রিপোর্টে গডফাদারদের নিয়ন্ত্রণকারী, গোপনে অর্থ লগ্নিকারী, পৃষ্ঠপোষক এবং গাঁজা চাষিদের নাম আলাদা ক্যাটাগরিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
অন্য একটি সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সিলেট বিভাগের মাদক নিয়ন্ত্রণ ৩৪ গডফাদারের হাতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের আবদুল মান্নান, জকিগঞ্জের আবদুল কাদির, মো. মুকিত, তাজউদ্দিন তাজুল মেম্বার, জহিরুল হক, আসুক আহমেদ আশিক, শরীফ আহমেদ তফাদার, জয়নার উদ্দিন। হবিগঞ্জের মাধবপুর সুয়াগাঁওয়ের ফুয়াদ হাসান সাকিব, ধর্মঘরের খোকন মিয়া, মামুন মিয়া। কিছুদিন আগে যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন সাকিব।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণার পর মন্ত্রণালয়ে জমা হওয়া বিভিন্ন সংস্থার সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পুলিশের দেওয়া তালিকায় রয়েছে ১৯ হাজার ৪৫ কারবারির নাম। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তালিকায় ৩ হাজার ৯৬৪ জন। এ ছাড়া আরও চারটি সংস্থা মাদক কারবারিদের তালিকা জমা দিয়েছে, যার একটি তালিকায় ২০ হাজার ৮৯১ জনের তথ্য উঠে এসেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছেন, জিরো টলারেন্স বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশনা থাকলেও প্রত্যাশিত সাফল্য মিলছে না। এতে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে শীর্ষ পর্যায় থেকে। মাদকবিরোধী অভিযান আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি পাওয়া গেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলাকে মাদক কারবারের বিশেষ জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। টেকনাফে সক্রিয়দের মধ্যে রয়েছেন হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম সাতঘরিয়া পাড়ার মো. নুর (বার্মাইয়া নুর), জাহেদ হোসেন; টেকনাফ সদর ইউনিয়নের এখলাছ মিয়ার ছেলে হারুন অর রশিদ, ২ নম্বর ওয়ার্ডের জহির আহমেদের ছেলে ফয়েজ আহমদ, শাহপরীর দ্বীপের জিয়াবুল হক (জিয়া), সাবরাংয়ের জাফর আলম, জালিয়াপাড়ার দিদারুল আলম, হ্নীলা বাজার পাড়ার সামসু মিয়াসহ আরও কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও তাদের স্বজন।
কক্সবাজার জেলায়ও সক্রিয় রয়েছেন ঝিলংজা ইউনিয়নের সামছুন্নাহার, উত্তর টেকপাড়ার মো. হাসান, উত্তর নুনিয়ারছড়ার জহুরুল ইসলাম (ফারুক), নুরুল আলম (বাবু), আবুল কালাম, সৈয়দ আলম, বশির আহমদ, আবদুল গফুর, রাশেদুল ইসলাম, আবু জাফর আনসারী, শাহজাহান আনসারী, রশিদ আনসারী, মিয়ানমারের নাগরিক আবু নফর (বার্মাইয়া নফর), মো. ইমাম শরীফ, মঞ্জুর আলম (শিয়াল মঞ্জুর), হারুনুর রশিদ লিটন, আবদুর রহমান প্রমুখ।
কক্সবাজারের পরই মাদক কারবারের অন্যতম জেলা কুমিল্লা। সীমান্তপথ ব্যবহার করে গাঁজা ও ফেনসিডিল পাচার হয়। কুমিল্লায় সক্রিয়দের মধ্যে রয়েছেন ধর্মপুর কলেজপাড়ার আশিক (বোমা আশিক), আবুল কাশেম, মথুরাপুরের মিজান, নুর ইসলাম (নুরু মিয়া), মো. কাশেম, মো. শফিক মিয়া, হুমায়ুন, বিল্লাল, মো. বাপ্পি, সুজন মিয়া, মোতালেব, মো. ইব্রাহিম খলিল (সজল), মো. সুমন আহম্মেদ, মো. মামুন, সিরাজ মিয়া, মো. ইকবাল হোসেন।
রাজশাহীতে গডফাদারের মধ্যে রয়েছেন গোদাগাড়ীর শীষ মোহাম্মদ, টিপু, মো. তোফাজ্জল হোসেন, নওশাদ আলী, আবদুল্লাহ, জিয়ারুল ইসলাম, সেতাবুর রহমান বাবু, মোছা. আজিজা বেগম, মীরগঞ্জের মো. ইদ্রিস মোল্লা, ইয়াদুল (ইদুল্লা), আবদুল আলিম (কালু), মো. মিলন।
পুলিশ সদও দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এটি আরও ত্বরান্বিত করার বিষয়ে কাজ চলছে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) পরিচালক (অপারেশনস) মো. বশির আহমেদ বলেন, ‘বিশেষ অভিযান, ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা, শীর্ষ কারবারি গ্রেপ্তার, পুনর্বাসন ও সরবরাহ চেইন কমাতে কাজ চলছে। অপারেশনাল কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও তা মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।’
র্যাবের তালিকায় ৩ হাজার ৭৬ মাদক কারবারি চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে র্যাব-২ এলাকায় সর্বোচ্চ ৫৬৫ জন এবং সর্বনিম্ন র্যাব-৪ এলাকায় ৫৩ জন। এ ছাড়া র্যাব-১-এ ২২২, র্যাব-৩-এ ১৩৮, র্যাব-৫-এ ৩২৮, র্যাব-৬-এ ১২৯, র্যাব-৭-এ ১২৩, র্যাব-৮-এ ৩৬৯, র্যাব-৯-এ ১২৭, র্যাব-১০-এ ৬৪, র্যাব-১১-এ ৪৮, র্যাব-১২-এ ৩৮২, র্যাব-১৩-এ ১৬৬, র্যাব-১৪-এ ২৯৪ এবং র্যাব-১৫-এ ৮৮ জন রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ট্যাংকের তলায় ছিদ্র রেখে ওপর দিয়ে পানি ঢাললে হবে না। লোকদেখানো তালিকা বা অভিযান দিয়ে মাদক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।’