আজ ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘খোকা’। তিনি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির ‘মুজিব ভাই’ ও ‘বঙ্গবন্ধু’।
শেখ মুজিবুর রহমান কিশোর বয়সেই সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে তিনি প্রথমবার কারাবরণ করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ মুজিব ছিলেন তরুণ ছাত্রনেতা। পরে তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতি হন।
১৯৬৬–এর ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন।
বঙ্গবন্ধুর ডাকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাঙালি জাতি। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে ১২ জানুয়ারি তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার হাতে স্ব-পরিবার নিহত হন তিনি।
১৯২০ সালের এই দিনে ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে তাঁর জন্ম।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি বাঙালির অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন এবং ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি প্রথমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং পরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ব্রিটিশ ভারত ও পরবর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেন, যা বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে নতুন গতি আনে।
১৯৬৮ সালে তাঁকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়। তবে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গণঅভ্যুত্থান ও জনচাপের মুখে পাকিস্তান সরকার মামলা প্রত্যাহার করে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্তির পর ছাত্র–জনতা তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে।
শৈশবে ‘খোকা’ নামে পরিচিত মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে দেওয়া ঐতিহাসিক ভাষণকে পরে বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় UNESCO।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করে তাঁর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করলে ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। একই বছরের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) তিনি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
২৫ মার্চ রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। পরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি কারামুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডির বাসভবনে সপরিবারে নিহত হন বঙ্গবন্ধু।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দিনটির রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সরকারি ছুটি বাতিল করে। সেই সঙ্গে ২০০৯ সাল থেকে পালিত জাতীয় শিশু দিবসও বন্ধ হয়ে যায়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবারও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ঘিরে কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে না।