রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলাকেটে ও শরীর ক্ষতবিক্ষত করে হত্যার ঘটনায় মূল আসামি সোহেল রানা (৩০) আদালতে দোষ স্বীকার করে লোমহর্ষক জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার আগে সে ইয়াবা সেবন করেছিল বলে আদালতকে জানায়।
বুধবার (২০ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আসামি সোহেল রানার এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। অপরদিকে, হত্যাকাণ্ডে সহায়তার অভিযোগে গ্রেপ্তার সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
জবানবন্দিতে যা জানালো ঘাতক সোহেলঃ
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মাদকাসক্ত সোহেল জানায়, ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তার পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না। গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে তাদের ফ্ল্যাটের রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর ইয়াবা সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া সোহেল শিশু রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষণের শিকার হয়ে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
এরই মধ্যে রামিসার মা বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়তে থাকলে ধরা পড়ার ভয়ে সোহেল শিশুটিকে গলাকেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসার মাথা কেটে গলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এছাড়া তার দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে এবং ছুরি দিয়ে যৌনাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করে। মরদেহটি বাথরুম থেকে শোবার ঘরের খাটের নিচে এবং বিচ্ছিন্ন মাথাটি একটি বড় বালতির ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়। ঘটনার সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না একই রুমে উপস্থিত ছিল। এরপর জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল।
যেভাবে উদ্ধার হলো মরদেহ ও গ্রেপ্তার আসামিরাঃ
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তার মা। একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের (সোহেলদের) দরজার সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি।
অনেক ডাকাডাকির পরও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ এবং একটি বালতির ভেতরে তার বিচ্ছিন্ন মাথা দেখতে পান তারা। এ সময় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তারা তাকে আটকে রাখেন।
খবর পেয়ে জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এর মাধ্যমে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে মূল ঘাতক সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
এ নৃশংস ঘটনার পর আজ বুধবার ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। দুপুরে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অহিদুজ্জামান আসামিদের ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে পৃথক দুটি আবেদন করেন।
আসামি সোহেল রানা’র স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করার আবেদন জানালে আদালত তা রেকর্ড করে তাকে কারাগারে পাঠান। এসময় অপর আসামি স্বপ্না আক্তার -তাকে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে আটকে রাখার আর্জি জানানো হলে আদালত হাজতি পরোয়ানা মূলে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। শুনানি চলাকালে স্বপ্নার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না।
এরআগে, মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন নজরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।