জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। তাকে গ্রেফতারের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। এ মামলায় তাকে দুই দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করেছিল গোয়েন্দা পুলিশ। অন্যদিকে শিরীন শারমিনের পক্ষে জামিনের আবেদন করেছিলেন তার আইনজীবী। মঙ্গলবার শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা আবেদন দুটি নাকচ করে শিরীন শারমিনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এনিয়ে অবসান হলো সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর দীর্ঘদিনের ‘নিখোঁজ’ রহস্যের।
আদালতে হাজিরা ও ২ দিনের রিমান্ড আবেদনঃ
মঙ্গলবার দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে আদালত চত্বরে আনা হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে প্রথমে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। রাজধানীর লালবাগ থানায় দায়ের করা আশরাফুল ওরফে ফাহিম নামে এক যুবককে হত্যাচেষ্টা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মোহসীন উদ্দীন সাবেক এই স্পিকারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ২ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছেন। রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মামলার ১ নম্বর আসামি শেখ হাসিনা এবং ৩ নম্বর আসামি শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ অন্যরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের নেপথ্যে ছিলেন। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
এতদিন কোথায় ছিলেন: আত্মগোপন নাকি সেনানিবাস?
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী জনসমক্ষ থেকে আড়ালে চলে যান। গত ২ সেপ্টেম্বর তিনি স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করলেও তার অবস্থান নিয়ে রহস্য কাটছিল না।
ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ধানমন্ডির ৮/এ রোডের একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়। বাসাটি তার চাচাতো ভাই আরিফ মাসুদ চৌধুরীর বলে জানা গেছে। তবে এর আগে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছিল, তিনিসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা সেনানিবাসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কতদিন সেখানে ছিলেন এবং সেখান থেকে কীভাবে ধানমন্ডির বাসায় পৌঁছালেন।
পাসপোর্ট বিতর্ক ও বিশেষ সুবিধাঃ
আত্মগোপনে থাকাকালে শিরীন শারমিন চৌধুরীর পাসপোর্ট আবেদন নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সশরীরে উপস্থিত না হয়েও বিশেষ ব্যবস্থায় তিনি ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও চোখের মণি বা বায়োমেট্রিক দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিষয়টি জানাজানি হলে পাসপোর্ট অধিদপ্তর তার আবেদনটি স্থগিত করে। কার ইশারায় বা কার সহায়তায় তিনি এই অবৈধ সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬টি মামলার তথ্য ও তদন্তের গতিপথঃ
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাবেক স্পিকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট হত্যা মামলাসহ মোট ৬টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রংপুরের স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলা এবং উত্তরা ও বনানী থানার একাধিক সহিংসতা মামলা। তবে তিনটি মামলায় ইতোমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে এবং বাকি তিনটি মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
‘কম বিতর্কিত’ ইমেজ বনাম আইনি লড়াইঃ
আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে তুলনামূলকভাবে ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির’ নেতা হিসেবে দেখা হতো। ২০১৩ সালে স্পিকার হওয়ার পর থেকে তিনি সংসদ পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে দমন-পীড়নের পরিকল্পনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ সেই ইমেজকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে ৫ আগস্টের আগের ও পরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জট খুলতে পারে। বর্তমানে আদালতের আদেশের অপেক্ষায় থাকা এই গ্রেফতারি ঘটনাটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
আড়াল থেকে গ্রেপ্তার: যেভাবে কেটেছে সাবেক স্পিকারের অন্তরাল জীবনঃ
আড়াল থেকে গ্রেপ্তার: যেভাবে কেটেছে সাবেক স্পিকারের অন্তরাল জীবনঃ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের শীর্ষ নেতাদের মতো শিরীন শারমিন চৌধুরীও লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে তার অনুপস্থিতি এবং পরবর্তীতে সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়ার গুঞ্জন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ছিল। আইএসপিআর সেই সময় দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সেনা হেফাজতে থাকার কথা জানালেও শিরীন শারমিনের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ২৭ দিনের মাথায় ২ সেপ্টেম্বর তিনি স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
অন্তরাল জীবনে থাকাকালীনই ২০২৪ সালের আগস্টে রংপুরে এক স্বর্ণশ্রমিক হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়। এরপর নভেম্বরে তার সাধারণ পাসপোর্টের আবেদন মামলার কারণে স্থগিত করে দেয় পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তর। এমনকি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নতুন এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানেও তিনি অনুপস্থিত ছিলেন, যার ফলে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সেই শপথ পরিচালনা করেন। ২০০৯ সালে সংরক্ষিত আসনে এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করা শিরীন শারমিন ২০১৩ সালে দেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং টানা তিন মেয়াদে ওই পদে আসীন ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের পর মঙ্গলবার ধানমন্ডির এক আত্মীয়ের বাসা থেকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে অবসান ঘটল তার দীর্ঘদিনের রহস্যময় আত্মগোপন পর্বের।
রাজনৈতিক অবস্থান: আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সবসময় 'মার্জিত' ও 'বিতর্কমুক্ত' নেত্রী হিসেবে দেখা হতো। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি সংসদীয় দায়িত্বে ছিলেন। এসময় কি তিনি হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহন করতে পারে —এ নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েছে।
জনমনে নানা প্রশ্ন: গ্রেপ্তার নিয়ে যত কৌতূহল!
সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে নানামুখী আলোচনার ঝড় উঠেছে। দীর্ঘ ৮ মাস তিনি কোথায় এবং কার আশ্রয়ে ছিলেন, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি কৌতূহল। জনমনে মূলত নিচের প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে:
রাজনৈতিক অবস্থান: আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সবসময় 'মার্জিত' ও 'বিতর্কমুক্ত' নেত্রী হিসেবে দেখা হতো। জুলাই আন্দোলনের সময় তিনি সংসদীয় দায়িত্বে ছিলেন। এসময় কি তিনি হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহন করতে পারে —এ নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েছে।
দীর্ঘ আট মাস তিনি কোথায় ছিলেন? ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের প্রায় সব শীর্ষ নেতা আত্মগোপনে চলে গেলেও শিরীন শারমিনের অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি ধোঁয়াশা ছিল। তিনি কি শুরু থেকেই দেশে ছিলেন, নাকি বিদেশ থেকে সম্প্রতি ফিরেছেন—এই রহস্যের উত্তর খুঁজছে সাধারণ মানুষ।
সেনানিবাস থেকে ধানমন্ডি: গতিপথ কী ছিল? আইএসপিআর-এর তথ্যানুযায়ী সেনানিবাসে আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় তার নাম থাকার গুঞ্জন ছিল। যদি তিনি সেখানে থেকে থাকেন, তবে সেখান থেকে বের হয়ে ধানমন্ডিতে আত্মীয়ের বাসায় তিনি কবে এবং কীভাবে পৌঁছালেন?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা: দেশের একজন সাবেক স্পিকারের মতো অতি-গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (VIP) এত দীর্ঘ সময় ঢাকায় আত্মগোপনে থাকা সত্ত্বেও পুলিশ বা গোয়েন্দা সংস্থা কি সত্যিই তার অবস্থান জানতো না? নাকি কৌশলগত কোনো কারণে তাকে এতদিন গ্রেপ্তার করা হয়নি?
পাসপোর্ট আবেদন রহস্য: পাসপোর্ট অফিসে সশরীরে উপস্থিত না হয়েও তিনি কীভাবে বিশেষ সুবিধায় বায়োমেট্রিক দিতে পারলেন? এই প্রক্রিয়ায় ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের ভেতর থেকে তাকে কারা সহায়তা করেছিল?
রাজনৈতিক অবস্থান: আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সবসময় 'মার্জিত' ও 'বিতর্কমুক্ত' নেত্রী হিসেবে দেখা হতো। জুলাই আন্দোলনের সময় যখন নির্বিচারে গুলিবর্ষণ হচ্ছিল, তখন স্পিকার হিসেবে তার ভূমিকা বা নীরবতা কেন ছিল—এ নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্ন রয়েছে।
নতুন এমপিদের শপথের অনুপস্থিতি: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত এমপিদের শপথ অনুষ্ঠানে তিনি কেন উপস্থিত হতে পারলেন না এবং শেষ মুহূর্তে কেন সিইসিকে শপথ পড়াতে হলো—এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।