বাংলাদেশের অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরে এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলমান অচলাবস্থায় দেশ ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে। কনটেইনার টার্মিনাল ইজারা সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে বন্দরে মাল ওঠানামাসহ প্রায় সব কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ায় শত শত জাহাজ বহির্নোঙরে আটকে আছে। এতে প্রতিদিন শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা।
বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, আন্দোলন শুরু হওয়ার পরপরই নৌপরিবহন উপদেষ্টার কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকারের উদাসীনতায় সংকট ঘনীভূত হয়। ব্যবসায়ীদের তীব্র উদ্বেগ প্রকাশের ছয় দিন পর গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন বন্দরে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। আলোচনার পর দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত হলেও এটিকে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে পড়ায় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে গার্মেন্টস খাত মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। সামনে সংসদ নির্বাচন ও রমজান মাস থাকায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, এখনই সংকট নিরসন না হলে দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে।
চলমান অচলাবস্থার পেছনে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। শ্রমিক সংগঠনগুলোর লাগাতার কর্মসূচির কারণে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বহির্নোঙরে আটকে আছে লাখ লাখ টন ভোগ্যপণ্য, আর বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন—অপারেটর কে, তা নয়; তাদের প্রধান দাবি দ্রুত পণ্য ওঠানামা ও বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা।
এ অবস্থায় দেশের ১০টি শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন যৌথ বিবৃতিতে চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে সৃষ্ট সংকটকে ‘মহাবিপর্যয়’ আখ্যা দিয়ে দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, বন্দর সচল না হলে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন সময়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অবকাঠামো নিয়ে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া অযৌক্তিক। তাদের মতে, বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের হাতে ছেড়ে দিয়ে সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খোঁজা জরুরি। অন্যথায় চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতিকে এমন এক সংকটে ঠেলে দেবে, যেখান থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে পড়বে।