তেহরান/ওয়াশিংটন: ইরানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ভূপাতিত মার্কিন এফ-১৫ই (F-15E) যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ পাইলটকে এক রুদ্ধশ্বাস ও নাটকীয় অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী। গত দুই দিনের স্নায়ুক্ষয়ী উত্তেজনা ও দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মরিয়া তল্লাশির অবসান ঘটিয়ে রোববার (৫ এপ্রিল, ২০২৬) ভোরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই অভাবনীয় সাফল্যের খবর নিশ্চিত করেছেন। এই উদ্ধার অভিযান কেবল একজন সেনার জীবনই রক্ষা করেনি, বরং চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে এক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা ও ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
রুদ্ধশ্বাস অভিযান ও তেহরানের ব্যর্থতা:
গত শুক্রবার দক্ষিণ ইরানের আকাশসীমায় ইরানের ‘উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার’ আঘাতে মার্কিন যুদ্ধবিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় এক মহানাটকীয় লড়াই। একদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এবং যাযাবর উপজাতিরা ৬০ হাজার ডলার পুরস্কারের লোভে পাহাড়-জঙ্গল চষে বেড়াচ্ছিল, অন্যদিকে মার্কিন বাহিনী তাদের পাইলটকে উদ্ধারে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
রোববার সকালে পরিচালিত এই চূড়ান্ত অভিযানে মার্কিন বিশেষ বাহিনী ইরানের ভূখণ্ডে প্রায় সাত ঘণ্টা অবস্থান করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতে, এটি ছিল মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম ‘দুঃসাহসিক’ এবং ‘অস্বাভাবিক’ উদ্ধার অভিযান। অভিযানে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বন্দুকযুদ্ধ হয়, যাতে অন্তত ৯ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। ইরান দুটি মার্কিন হেলিকপ্টার ধ্বংসের দাবি করলেও, পাইলটকে যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করার যে ‘কৌশলগত বিজয়’ তেহরান খুঁজছিল, তা শেষ পর্যন্ত হাতছাড়া হয়েছে।
ট্রাম্পের হাতে নতুন ‘রণকৌশল’:
বিশ্লেষকদের মতে, পাইলট উদ্ধার হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন অনেক বেশি নির্ভার এবং আক্রমণাত্মক অবস্থানে। অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আমিন সাইকাল আল-জাজিরাকে জানান, "এই উদ্ধার অভিযান ট্রাম্পকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত বড় ধরনের চাপমুক্ত করেছে। এখন তিনি কোনো পিছুটান ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে তার কঠোরতম রণকৌশল প্রয়োগ করতে পারবেন।"
ইতিমধ্যেই ট্রাম্প ইরানকে তাদের জ্বালানি কেন্দ্রগুলোতে বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়ে রেখেছেন এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। মার্কিন পাইলট যুদ্ধবন্দী হলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর যে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতো, এই সফল অভিযান তা পুরোপুরি ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
বিপজ্জনক মোড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি:
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ২,০৭৬ জন নিহত এবং ২৬,৫০০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যুদ্ধের শুরুতেই সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের হারিয়ে ইরান যখন কোণঠাসা, তখন মার্কিন পাইলটকে আটকের চেষ্টা ছিল তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর একটি বড় তুরুপের তাস।
কিন্তু পাইলট উদ্ধারের ফলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর মনোবল এখন তুঙ্গে। একইসঙ্গে তেহরানের দাবি করা ‘উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার’ কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনা ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র জোটকে ইরানের অভ্যন্তরে আরও বড় ধরনের হামলা চালাতে উৎসাহিত করবে।
শান্তির পথ কি রুদ্ধ?:
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উদ্ধার অভিযান যুদ্ধের ৩৭তম দিনে এসে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হার না মানা সামরিক দম্ভ, অন্যদিকে ইরানের ভূখণ্ডে মার্কিন বিশেষ বাহিনীর দীর্ঘ উপস্থিতি—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে। ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ যদি সত্যিই ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হয়, তবে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা, বিবিসি ও ট্রুথ সোশ্যাল।